:::: MENU ::::
  • slider image 1

    Take my hand, take my whole life too.

  • slider image 2

    I never want to live without you

  • slider image 3

    I am who I am because of you.

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৫

  • ১০:৫১:০০ PM

সুনসান নীরবতা চারিদিকে।গাড়ির মধ্যে যে ক'জন যাত্রী আছে তারাও সবাই অঘোর ঘুমে অচেতন। শুধু নীলের চোখে ঘুম নেই।সাধারণত গাড়িতে উঠলে ঘুম-টুম আসে না ওর।কিন্তু শরতের নাতিশীতোষ্ণ এমন এক রাতে বাহিরের খোলা হাওয়া যখন মুখে এসে লাগে তখন ঘুম আপনা আপনি চলে আসে।নীলও খানিকটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলো বৈ কি! কিন্তু হঠাৎ করে চেতনা ফিরে সামনে তাকাতেই রাতের অপূর্ব সৌন্দর্য ওর ঘুম কেরে নিলো।সত্যি অপূর্ব সুন্দর লাগছে। যতদূর চোখ যায় টানা রাস্তা। একদম ফাঁকা।
শা শা করে গাড়ি এগিয়ে চলছে কিন্তু
ফাঁকা রাস্তার দু পাশে দাড়িয়ে থাকা গাছ গুলোর উপর গাড়ির হেড লাইট পড়ে মনে হচ্ছে কোন গুহার মধ্যে স্থির দাড়িয়ে আছে গাড়িটা আর দু পাশের গাছ গুলো দ্রুত সরে যাচ্ছে পেছন দিকে। বহুদূর পর্যন্ত কোন যানবাহনের চিহ্ন চোখে পড়ছে না।যেন অন্য কোন পৃথিবীতে, অন্য কোন রাস্তা এটা।কিন্তু ছোট বেলা থেকে কতবার যে এ রাস্তায় যাতায়াত করেছে তার হিসেব নেই। আসে পাশের সব কিছু নীলের নখ দর্পণে। তারপরেও সব কিছু অচেনা, ভারী অচেনা লাগছে আজ।
নীল ওর ব্যাগ থেকে হেডফোন টা বের করে কানে লাগালো।এই মুহূর্তে ও কোন গান শুনবে না, ওর নাকি গভীর রাতে গান শুনার চেয়ে ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক শুনতে ভালো লাগে। তাও সলো মিউজিক।বিশেষ করে গিটার কিংবা সেতারের । ফোন ঘেটে ঘুটে বেশ কয়েকটা মিউজিক সিলেক্ট করে রিপিট অল করে দিলো। হেডফোনের ভলিউম টা মাঝামাঝি রেখে হেলান দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে এই প্রকৃতি উপভোগ করার মজাটাই আলাদা।এর আগেও যতবার কোথাও গেছে সে ট্রেনেই হোক আর বাসেই হোক,এই মজাটা নিতে ভুলে নি।
ওর মতে,
"যদি দু'চোখ ভরে পৃথিবীকে দেখতেই না পেলাম তবে এ দু'চোখের মূল্য কি!  প্রাণ ভরে কোন কিছু দেখার চেয়ে আনন্দের কিছু নাই।সে রমনীই হোক আর প্রকৃতিই হোক।তাই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এই আনন্দ আমি মিস করতে চাই না।"
গাড়ি দ্রুত বেগে এগিয়ে চলছে সামনের দিকে,আর দু'পাশের গাছ গুলো সরে যাচ্ছে পেছনে। অনেক ক্ষন পরপর দু'একটা নাইট কোচ কিংবা ট্রাক হেড লাইট উচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে শা শা করে। ওর কানের মধ্যে এখন অনুপমের "প্রিয়তমা" গানটার "গীটার" বাজছে।অসাধারণ সুন্দর গানের লিরিকটা।
"চলে এসো আজ এ রাতে,
চলে এসো আমার কাছে...  প্রিয়তমা। "
গানটা প্রথম ওকে কান্তা শুনিয়েছিলো।বলেছিলো, "তুমি এ গানটা শুনলে পাগল হয়ে যাবা! "
সত্যি গানটা ওকে পাগল করে দিয়েছিলো।  পাগল করে দিয়েছে কান্তার প্রেমে।
গান শুনতে শুনতে হঠাৎই স্মৃতির দরজায় বিগত দিনগুলি এসে একে একে জমা হতে শুরু করলো।যেন স্মৃতিরা ওকে ডেকে ডেকে বলছে,"এই নীল,দেখো আজ আমি নীল শাড়ি পড়েছি! "
"এই,আমার একটা ছবি তুলো না, প্লিজ? "
"ওভাবে না,এভাবে । দুজন এক সাথে উঠবো। "
"তোমার গালটাকে খুব মিস করছি।তোমার গালে একটা কামড় দেই? "
নীল স্মৃতির রাজ্যে যেন এক নবাগত সওয়ারী। চোখের পাতায় দিনগুলি ভাসছে ফাস্ট ফরওয়ার্ড মুডে। আর ও মিটিমিটি হাসছে কান্তার পাগলিপনা দেখে! আর এই পাগলির জন্য একটু আধটু কেন, পুরো পাগল হওয়া যায়।
স্মৃতির দরজায় বিগত দিনগুলি একটা একটা করে ভীর করছে।আর কান্তার অশরীরী উপস্থিতি ওর সমস্ত সত্তা জুড়ে।হঠাৎ কান্তা যেন ডেকে উঠলো-
"এই যে দেখো দেখো, সেই পুরোনো রেস্তোরাটা।
মনে আছে,প্রথম যেদিন তোমার সাথে বেড়িয়েছিলাম সেদিন এখানেই খেয়েছিলাম?"
সাথে সাথে গাড়ি ব্রেক করলো। নীলের স্মৃতির রাজ্য অদৃশ্য হয়ে ধরা দিলো বাস্তবতায়। ইতোমধ্যে গাড়ির ভেতরের দু একটা লাইট জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ।গাড়ির স্পিড ক্রমশ কমে আসছে। নীল একটা হেলে সামনে তাকিয়ে বুঝতে পারলো খাবারের জন্য হোটেল ব্রেক।
কিন্তু কি আশ্চর্য!
সেই হোটেল! হোটেল নূরজাহান,কুমিল্লা। কান্তা শখ করে এটাকে বলত "পুরোনো রেস্তোরা "।আর এই তো এই মাত্র কান্তা ওকে বলেছিলো "দেখো দেখো,সেই পুরোনো রেস্তরাঁ। "
এখনো সে কথা নীলের কানে বাজছে।একটু হেসে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে মনে মনে বলল,"কান্তা,আই মিস ইউ।আই মিস ইউ সো মাচ।"
হোটেল ব্রেক শেষ।গাড়ি ধীরে ধীরে গড়িয়ে হাই ওয়ে তে উঠে টানতে শুরু করলো।  এখন রাত প্রায় দু'টো বাজে।গাড়ি চট্টগ্রাম পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল প্রায় সাতটা আটটা বেজে যাবে।কান্তা প্রেগন্যান্ট, আর তিন চারদিনের মধ্যে ওদের ঘর আলো করে নতুন অতিথি আসবে। কিন্তু  কি জানি,এই ক্লান্ত-শ্রান্ত,শতত বিধ্বস্ত শরীর দেখে কান্তা কি বলবে! নিশ্চয়ই অভিমানের সুরে বলবে,"খুব কষ্ট হয়েছে না! আই এম সরি, আমার জন্য তোমাকে এতটা কষ্ট করতে হলো।"
কিন্তু কান্তা জানে,নীলের কাছে পৃথিবীর সব কিছু একদিকে আর কান্তা অন্যদিকে। ও সব কিছুকে ছেড়ে তুড়ি মেরে চলে আসতে পারে,কিন্তু কান্তাকে না।ওর জন্য পৃথিবীকে অবলীলায় ছেড়ে দিতে পারে নীল।এতটাই ভালোবাসে কান্তাকে।
কান্তার যেবার টাইফয়েড হয়েছিলো, সেবার প্রায় এক মাস কান্তাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি ও।বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি। বসের কাছে ছুটি চেয়ে যখন পেলো না তখন অর্ধ লক্ষের উপরের সেলারিকে পায়ে দলে কান্তার পাশে পাশে ছিলো। কান্তা বারবার ওকে বলেছিলো, "চাকরী টা ছেড়ে দিও না,কর।আমি ঠিক হয়ে যাব।"
কিন্তু নীলের একটাই কথা, চাকুরী জীবনে বহু পাবো।কিন্তু তোমাকে পাবো না।আর আমার সামান্য চাকুরীর জন্য তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনা।অবশ্য মাস খানেক পর যখন কান্তা সুস্থ হয়ে উঠলো তখন নীল আবার চাকুরীর জন্য চেষ্টা করতে শুরু করলো। মাস না যেতেই আরেকটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে নিয়োগ পেলো।  শুনেছি,ভাইভা বোর্ডে নাকি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলো,আগের চাকুরী টা কেন ছেড়েছে।ও সরাসরি বলেছিলো, "আমার ওয়াইফ অসুস্থ ছিলো তাই ছুটি চেয়েছিলাম । দেয়নি তাই ছেড়ে দিয়েছি । " ভাইভা বোর্ড নীলকে আবার যখন জিজ্ঞাসা করলো, "আপনি কি তবে এ চাকুরীও ছেড়ে দিবেন, যদি আপনাকে ছুটি না দেয়া হয়? "
নীল বলেছিলো, "কান্তার জন্য ওর কাছে অন্য সব কিছু তুচ্ছ ।অন্য কোন কারনে ছুটি না পেলেও তার ওয়াইফ এর অসুস্থতার ব্যাপারে কোন কম্প্রোমাইজ করতে পারবে না। "
তারপর
কোম্পানি ওকে শুধু চাকুরীই দেয়নি বরং কোম্পানির এম ডি সাহেব ও তার ওয়াইফ নিজে এসেছিলেন কান্তার সাথে দেখা করতে।নীল কোম্পানির এমপ্লয়িদের মধ্যে সবচেয়ে স্মার্ট,হ্যান্ডসাম এবং জিনিয়াস হিসেবে ইতোমধ্যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মাসে সোয়া লাখের উপর সেলারি।কোম্পানির নিজস্ব বাসা পেয়েছে নীল। কান্তার বাবু হবে, নীল বারবার বলেছিলো, ঢাকা তেই থাকতে কিংবা ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি করতে।কিন্তু কান্তা রাজি হয়নি।ওর একটাই কথা, প্রথম বাচ্চাটা বাবা-মার বাড়িতে হবে। ও বলে,"আমার বাচ্চা হবে আমার বাবা-মায়ের আশীর্বাদের হাত মাথায় নিয়ে।আমি হাসপাতালে যেতে চাই না।"
নীল অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে রাজি করাতে পারেনি।এমনকি এটাও বলেছিলো, "দরকার হলে আব্বা-আম্মাকে ঢাকায় নিয়ে আসি।এত বড় বাসা।আরো দশজন মানুষ থাকলেও কোন সমস্যা নেই।"  কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কান্তাকে চট্টগ্রাম পাঠানো হলো। এছাড়া নীলের বাবা-মা নেই। দু'জনেই ইহলোক ত্যাগ করেছে বহু আগে তাই কান্তার কথা ও ফেলতেও পারলো না।নিজেও হয়ত এরকম একটা কিছু অনুভব করেছিলো সে। কিন্তু নীল কান্তাকে চট্টগ্রাম পাঠিয়েই যে ক্ষান্ত হয়েছে তা নয়। সেখানে সার্বক্ষণিক একজন নার্স,দু'জন কাজের লোক রেখেছে। প্রতি দুই দিন পর পর একজন এম বি বি এস ডাক্তার এসে কান্তাকে চেক আপ করে যায়। আর বাচ্চার জন্য প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে যেখানে যে খেলনা ভালো লাগে কিনে কিনে নিয়ে যায়,ঢাকার বাসায় জমা করে।
এসব দেখে কান্তা হেসে কুটি কুটি হয়। প্রকাশ্যে বলে,"ওকে কি পেটের মধ্যেই খেলতে দিবা নাকি? "
আর কানে কানে বলে,"শুধু বাবুর জন্য এত কিছু! বাবুর আম্মুর জন্য কই!বাবুর আম্মুর প্রতি ভালবাসা কি কমে গেল না কি।" তারপর হেসে কুটিকুটি হয়।
আজকেও অনেক অনেক খেলনা নিয়ে যাচ্ছে ও।অফিসের কাজে রাজশাহী এসে যেখানে যা দেখেছে কিনেছে।কান্তার জন্য রাজশাহী সিল্ক,বাবুর জন্য কাপড়,খেলনা ইত্যাদি ।

গাড়ি এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। বেশ কিছুক্ষণ আগে ফেনী পার হয়ে চট্টগ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।পাহাড়ের উপর দিয়ে সকালের সূর্য আভা ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে নতুন একটা দিনের শুরুর।আশে পাশের রাস্তাঘাটে ক্রমেই জন যাতায়াত বাড়ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রিয় মানুষের কাছে পৌছানোর স্নায়ুবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে নীলের সমস্ত দেহে।সারা রাতের ক্লান্তকর জার্নিকে যেন কিছুই মনে হচ্ছে না। চোখের সামনে অনাগত ভবিষ্যৎ এর সুখের কল্পনা। সমস্ত ঘর জুড়ে ছোট দু'খানা পায়ের চঞ্চল ছুটাছুটি, বাবার আদর,বাবুর মুখে প্রথম বাবা ডাক ইত্যাদি কেমন হবে তাই যেন ভেসে চলেছে নীলের কল্পনার আয়নায়।
গাড়ি দ্রুত এগিয়ে চলেছে । আর মিনিট ত্রিশের মধ্যে চট্টগ্রাম পৌছে যাবে।পাশ দিয়ে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে সকালের বাস গুলো ঢাকা বা অন্যান্য জায়গার উদ্দেশ্যে।
তারপর হঠাৎই একটা ধাক্কা । একটা আর্তনাদ। তারপর সব শেষ।
সমস্ত ঘর জুড়ে ছোট দু'খানা পায়ের চঞ্চল ছুটাছুটি, বাবার আদর,বাবুর মুখে প্রথম বাবা ডাক সব কিছু সমাধিত হলো একটা আর্তনাদে ।ভবিষ্যৎ থমকে গেলো পিচ ঢালা পথের পাশে ছিটকে পড়া নিথর দেহে।।
তারপর.... ।
এর আর কোন পর নেই।
#নীলকান্ত®
Writer information NILKANTO